চার মাসে ৩৬০ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

চার মাসে ৩৬০ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

আলতাফ মাসুদ | প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২০ ০১:৫৯; আপডেট: ২ আগস্ট ২০২১ ২২:১৭

ডলারের মূল্যমান ধরে রাখতে ও স্থানীয় বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়াতে গত চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৩৬০ কোটি ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির অংশ হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ওই পরিমাণের ডলার কেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, করোনার মধ্যে আমদানি কমে যাওয়া ও রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ডলার উদ্বৃত্ত হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করতে না পারায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ডলার নিয়ে আসছে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও মান ধরে রাখা ও টাকার সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে ব্যাংক থেকে উদ্বৃত্ত ডলার কিনে নেয়। এর মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও সর্বোচ্চ মাইলফলক ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার অতিক্রম করে।

৩৬০ কোটি ডলারের বিপরীতে ব্যাংকিং সিস্টেমে ৩০ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা হিসাবে) সরবরাহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা শিথিলকরণ ও ডলার কেনার মাধ্যমে টাকার সরবরাহ বাড়ানো ছাড়াও করোনার ক্ষতি মেটাতে পাঁচটি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের আরও ৩৮ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে। মুদ্রার প্রবাহ বাড়ায় চলতি আগস্ট শেষে দেশের ব্যাংকিং সিস্টেমে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯৭৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে দেশের অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরাতে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে বড় অংকের ডলার কেনার আরও একটি কারণ বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান।

চলতি বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নসহ ব্যবসায়ীদের ঋণ সুবিধা দিতে ব্যাংকগুলোর কাছে যাতে অতিরিক্ত তারল্য থাকে সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিমালা শিথিল করার উদ্যোগ নেয়। এছাড়াও করোনার সময় ঋণ আদায় প্রায় বন্ধ থাকায় ব্যাংকগুলো যাতে তারল্য সংকটে না পড়ে সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সস্তায় টাকা সরবরাহের সুযোগও নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তারল্য সরবরাহ বাড়ানোর অংশ হিসেবে সিআরআর ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনার মাধ্যমে ব্যাংকিং সিস্টেমে আরও ১৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সরবরাহ করেছে মুদ্রাবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও এক ধাপ এগিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে ব্যাংক রেট ৫ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনে। এছাড়াও করোনা পরিস্থিতিতে রেপো রেট ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে দুই ধাপে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক।

চলতি জুলাইয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেছিলেন যে, এটা পরিষ্কার যে, আর্থিক নীতি অবস্থান ও ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য আর্থিক কর্মসূচিগুলো সম্প্রসারণমূলক ও সুবিধাজনক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে করোনাভাইরাসের আগের অবস্থানে অর্থনৈতিক কর্মকা- ফিরিয়ে আনাই মুদ্রানীতির মূল লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

মুদ্রানীতিতে নেওয়া উদ্যোগের কারণে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য সবরাহের আরেকটি সুযোগ আসে। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে রেমিট্যান্সে কিছুটা ধীরগতির পর মে ও জুন মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। ফলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে রেমিট্যান্স দাঁড়ায় ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলারে। রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) প্রবাসীরা দেশে ৮৮৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬৬ কোটি ডলার বা ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি। ২০১৯ সালের একই সময়ে ৬১৬ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

রেমিট্যান্সে উল্লম্ফনের পাশাপাশি ধীরে ধীরে রপ্তানি আয়ও বাড়তে থাকে। বিপরীতে আমদানির পরিমাণ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত ডলার কিনতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদ্যমান প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। কারণ বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় ডলার উদ্বৃত্ত থাকছে। না কিনলে ডলারের দামে পতন ঘটবে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা। এতে রেমিট্যান্স পাঠাতে তারা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন। অপর দিকে রপ্তানি আয়ও কমে যাবে। প্রবাসী ও রপ্তানিকারকদের কথা চিন্তা করে বাজার থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এর ফলে অক্টোবর শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যার মধ্যে গত চার মাসে রিজার্ভে ৮ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে।

ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে উদ্বৃত্ত ডলার বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে নেওয়ায় ডলারের বিনিময় হার ৮৪ দশমিক ৮ টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। যদিও বিশ^ রপ্তানিতে দেশের রপ্তানিকারকদের সুবিধা দিতে টাকার অবমূল্যায়নের জোর দাবি থাকলেও সরকার মুদ্রার বর্তমান হারকে ধরে রাখতে চায়।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top